ঢাকা ০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রীতি চাকমা’র কবিতা || একদিন

  • আপ : ০৩:০০:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪২ ভিউ :

 

অপরাধ ছিল আমাদেরই।
স্বর্গের নিষিদ্ধ অমৃতস্পর্শে, দেবতাদের বিধান ভেঙে আমরা নেমে এলাম মর্ত্যের অনন্ত নির্বাসনে।
সেই থেকে যুগে যুগে, জন্মে জন্মে, নক্ষত্রের পথ ধরে আমরা একে অপরকে খুঁজে ফিরেছি –
কখনও প্রেমিক, কখনও পরাজিত যোদ্ধা, কখনও পথহারা যাযাবর হয়ে।
কুরুক্ষেত্রের রণধ্বনিমুখর প্রান্তরে তুমি যখন সেনাপতির রক্তাক্ত বেশে ধূলিতে লুটিয়ে পড়লে,
আমি তখন বৃন্দাবনের এক গোপকন্যা,
আমার বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ কেঁপে উঠেছিল,
যমুনার জল হয়েছিল নোনা,
বাঁশির সুর থেমে গিয়েছিল শোকের ভারে।
মানুষ বলে, সেই রাতে নক্ষত্রেরা পর্যন্ত আলো জ্বালাতে ভুলে গিয়েছিল।
তারপর বহু শতবর্ষ পরে,
কৈলাসের শুভ্র নীরবতার পথে পথে,
ভিখিরির ছিন্ন বসনে ঘুরে বেড়ানো এক যাযাবর তুমি
আবার আমায় চিনে নিলে।
দুই যুগান্তরের ক্লান্ত চোখ হঠাৎ এক মুহূর্তে মিলিত হলো
আর আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম একে অপরের বুকে,
যেন সমস্ত জন্মের কান্না এসে আশ্রয় পেল এক আলিঙ্গনে।
অজন্তার গুহার প্রাচীন প্রস্তরদেয়ালে আজও নাকি ক্ষীণ রঙে আঁকা আছে আমাদের সেই মিলনের ছবি-
সময়ের ক্ষয়ে বিবর্ণ, তবু অবিনশ্বর।
পুনর্জন্মের চাকা আবার ঘুরল।
ইউফ্রেটিসের তীরে তুমি জন্ম নিলে এক মেষপালক হয়ে,
আমি রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে বন্দিনী রাজনন্দিনী।
রাজদণ্ড, ধর্ম, সমাজ, বংশমর্যাদা
সবকিছু আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল,
তবু রাত্রির গোপন নক্ষত্রতলে আমাদের প্রেম জন্ম নিয়েছিল মরুভূমির ফুলের মতো।
কিন্তু নিয়তির অভিশাপ তখনও অটুট ছিল,
আমরা মিলেছিলাম, তবু পূর্ণ হইনি।
এরপর আমরা ঘুরেছি-
আন্দিজের তুষারচূড়ায়,
আমাজনের আদিম অরণ্যের অন্ধকারে,
রাইনের কুয়াশাভেজা তীরে,
সান্তা ফে ট্রেইলের ধূলিঝড়ে।
প্রতিটি জন্মে তুমি আমায় খুঁজেছ,
প্রতিটি জন্মে আমি তোমার প্রতীক্ষায় প্রদীপ জ্বেলে বসে থেকেছি।
সভ্যতা ভেঙেছে, সাম্রাজ্য ডুবেছে, ভাষা বদলেছে, দেবতারা পর্যন্ত বিস্মৃত হয়েছে,
কিন্তু আমাদের প্রেম-
সে কখনও মরেনি।
আমাদের গোপন অভিসার ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা হয়নি,
কোনও রাজকবি তার সম্পূর্ণ কাহিনী রচনা করতে পারেনি।
কারণ এই প্রেম মানুষের প্রেম ছিল না শুধু
এ ছিল নক্ষত্রেরও পূর্বেকার কোনো আদিম শপথ।
কিন্তু প্রিয়,
এই জন্ম আর পূর্বজন্মগুলোর মতো নয়।
এ জন্ম শেষ নির্বাসন।
শাপের অন্ধকার অবশেষে ক্ষয় হবে,
সময় তার চক্র থামাবে,
এবং সমস্ত জন্মের বিচ্ছেদ পেরিয়ে
আমরা আবার মিলিত হব –
যেমন নদী অবশেষে সাগরকে খুঁজে পায়,
যেমন রাত্রি অবশেষে ভোরের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
সেদিন আর কোনও মৃত্যু থাকবে না,
কোনও বিচ্ছেদ থাকবে না,
কোনও পুনর্জন্মের পথ থাকবে না।
শুধু তুমি আর আমি
অনন্তের নীরব সিংহাসনে,
অমর প্রেমের দুই চিরন্তন অধিবাসী হয়ে।
২৫.০৫.২০২৬

পঠিত

গোলাম কবির এর কবিতা || প্রিয় বিরহ, তোমার কাছে

রীতি চাকমা’র কবিতা || একদিন

আপ : ০৩:০০:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

অপরাধ ছিল আমাদেরই।
স্বর্গের নিষিদ্ধ অমৃতস্পর্শে, দেবতাদের বিধান ভেঙে আমরা নেমে এলাম মর্ত্যের অনন্ত নির্বাসনে।
সেই থেকে যুগে যুগে, জন্মে জন্মে, নক্ষত্রের পথ ধরে আমরা একে অপরকে খুঁজে ফিরেছি –
কখনও প্রেমিক, কখনও পরাজিত যোদ্ধা, কখনও পথহারা যাযাবর হয়ে।
কুরুক্ষেত্রের রণধ্বনিমুখর প্রান্তরে তুমি যখন সেনাপতির রক্তাক্ত বেশে ধূলিতে লুটিয়ে পড়লে,
আমি তখন বৃন্দাবনের এক গোপকন্যা,
আমার বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ কেঁপে উঠেছিল,
যমুনার জল হয়েছিল নোনা,
বাঁশির সুর থেমে গিয়েছিল শোকের ভারে।
মানুষ বলে, সেই রাতে নক্ষত্রেরা পর্যন্ত আলো জ্বালাতে ভুলে গিয়েছিল।
তারপর বহু শতবর্ষ পরে,
কৈলাসের শুভ্র নীরবতার পথে পথে,
ভিখিরির ছিন্ন বসনে ঘুরে বেড়ানো এক যাযাবর তুমি
আবার আমায় চিনে নিলে।
দুই যুগান্তরের ক্লান্ত চোখ হঠাৎ এক মুহূর্তে মিলিত হলো
আর আমরা ঝাঁপিয়ে পড়লাম একে অপরের বুকে,
যেন সমস্ত জন্মের কান্না এসে আশ্রয় পেল এক আলিঙ্গনে।
অজন্তার গুহার প্রাচীন প্রস্তরদেয়ালে আজও নাকি ক্ষীণ রঙে আঁকা আছে আমাদের সেই মিলনের ছবি-
সময়ের ক্ষয়ে বিবর্ণ, তবু অবিনশ্বর।
পুনর্জন্মের চাকা আবার ঘুরল।
ইউফ্রেটিসের তীরে তুমি জন্ম নিলে এক মেষপালক হয়ে,
আমি রাজপ্রাসাদের অন্তঃপুরে বন্দিনী রাজনন্দিনী।
রাজদণ্ড, ধর্ম, সমাজ, বংশমর্যাদা
সবকিছু আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল,
তবু রাত্রির গোপন নক্ষত্রতলে আমাদের প্রেম জন্ম নিয়েছিল মরুভূমির ফুলের মতো।
কিন্তু নিয়তির অভিশাপ তখনও অটুট ছিল,
আমরা মিলেছিলাম, তবু পূর্ণ হইনি।
এরপর আমরা ঘুরেছি-
আন্দিজের তুষারচূড়ায়,
আমাজনের আদিম অরণ্যের অন্ধকারে,
রাইনের কুয়াশাভেজা তীরে,
সান্তা ফে ট্রেইলের ধূলিঝড়ে।
প্রতিটি জন্মে তুমি আমায় খুঁজেছ,
প্রতিটি জন্মে আমি তোমার প্রতীক্ষায় প্রদীপ জ্বেলে বসে থেকেছি।
সভ্যতা ভেঙেছে, সাম্রাজ্য ডুবেছে, ভাষা বদলেছে, দেবতারা পর্যন্ত বিস্মৃত হয়েছে,
কিন্তু আমাদের প্রেম-
সে কখনও মরেনি।
আমাদের গোপন অভিসার ইতিহাসের পৃষ্ঠায় লেখা হয়নি,
কোনও রাজকবি তার সম্পূর্ণ কাহিনী রচনা করতে পারেনি।
কারণ এই প্রেম মানুষের প্রেম ছিল না শুধু
এ ছিল নক্ষত্রেরও পূর্বেকার কোনো আদিম শপথ।
কিন্তু প্রিয়,
এই জন্ম আর পূর্বজন্মগুলোর মতো নয়।
এ জন্ম শেষ নির্বাসন।
শাপের অন্ধকার অবশেষে ক্ষয় হবে,
সময় তার চক্র থামাবে,
এবং সমস্ত জন্মের বিচ্ছেদ পেরিয়ে
আমরা আবার মিলিত হব –
যেমন নদী অবশেষে সাগরকে খুঁজে পায়,
যেমন রাত্রি অবশেষে ভোরের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
সেদিন আর কোনও মৃত্যু থাকবে না,
কোনও বিচ্ছেদ থাকবে না,
কোনও পুনর্জন্মের পথ থাকবে না।
শুধু তুমি আর আমি
অনন্তের নীরব সিংহাসনে,
অমর প্রেমের দুই চিরন্তন অধিবাসী হয়ে।
২৫.০৫.২০২৬