এখন বোধহয় শরৎ কাল চলছে অথচ ঢাকা শহরের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা নেই। ঘন ঘোর বরষাকালের মত প্রতিদিন নিয়ম করে নামছে বৃষ্টি । দিনের বেলায় বেশ গরম। তবে রাতে এখন আর এসি লাগে না। হয়ত খুব ভোরে বাইরে বেরুলে ঘাসে ঘাসে শিশিরও দেখা যাবে। আমার অবশ্য ভোরের শিশির দেখা হয় না। আজকাল সকালে একটু দেরী করেই বিছানা ছাড়ি। কেউ স্কুলে যাবে,কেউ যাবে কলেজে ,কেউ অফিসে পরিবারের সবার সেই আয়োজনের ভাবনাগুলো এখন আমাকে আর উদ্বিগ্ন করে না।
এখন চোখ মেলেই ভাবনায় আসে দূর দেশে আমার ছোট ছেলে আর বৌমা এখন ঘুমের আয়োজন করছে। ওদের তো এখন বেশ রাত ! ক্লান্ত নাতিটা হয়ত এতক্ষনে ঘুমিয়েই পড়েছে। আমাদের দিন যখন শুরু হয়। তখন ওরা থাকে ঘুমের অতলে। আর বড় ছেলে ! ওদের এখন দিনের মাঝামাঝি সময়। ওরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অফিসের কাজে নাতনিটাও স্কুলে। আর মেয়েও নিশ্চয়ই ভার্সিটিতে পৌঁছে গেছে। আমাদের সবার ঘড়ির কাটা ভিন্ন ভিন্ন সময় দেয়।
আমি এখন ইচ্ছে করলেই সারাটা দিন কাটিয়ে দিতে পারি আলসেমী করেই। কিন্তু কোনো কাজ ছাড়া থাকাটা আমার কাছে সব সময়ই মনে হয় সময়ের অপব্যবহার। এ বয়সে এসে শুধু মনে হয়,সময় নষ্ট করার মত সময় আর হাতে নেই। প্রতিটি মুহূর্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ খুব।
গতবার যখন টরোন্টো যাবার টিকিট করবো ভাবছি। বড়ছেলে তখন বোস্টনে। সে আবদার করলো, আমি যেন ঈদটা টরোন্টোতে করি। তাহলে ওরা বোস্টন থেকে চলে আসবে। কতদিন ঈদ করা হয় না এক সাথে ! দুই ছেলের সাথে একসাথে ঈদ যেনো বহুকাল আগের এক স্বপ্ন। দূর আকাশে এক নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। যদিও ঈদ এখন আমার কাছে কোনো কাঙ্ক্ষিত দিন না। তবুও বড় ছেলে ন’ঘন্টা ড্রাইভ করে ঠিকই হাজির হয়েছিল টরোন্টোতে। মাত্র তিনরাতের জন্য। ঈদের সকালে একসাথে খেয়েছিলাম। আমার ঢাকার রান্নাঘরের ঈদের আয়োজন সেখানে ছিল না,ছিল না কোরবানির মাংস বা নানা রকম ভুঁড়ি ভোজ। এই সীমাবদ্ধতার ভেতরেও ওদের যে পরিতৃপ্তি ছিল ওটাই ছিল আমাদের ঈদ।
আমার আব্বা যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রতিটি দিনের শুরুতেই ফোন করতেন একবার। তারপর যতবার ফোন করতেন তার একটিই কথা থাকত,কবে আসবি তোরা? ব্যস্ততা, প্রয়োজন, সময় অসময় না বুঝে ছোট শিশুর মত আব্দার করতেন আর পথ চেয়ে বসে থাকতেন বারান্দায়।
বিয়ের পরও বেশ অনেক দিন বাবার বাড়ীটাকেই মনে হত ওটাই বুঝি আমার নিজের বাড়ি। সেখানে বেড়াতে যাওয়াটাই ছিল অবসর কাটানো,আরাম-আয়েশের একমাত্র জায়গা। সারাক্ষণ সুযোগ খুঁজে বেড়াতাম কোন অছিলায় ও বাড়িতে যাওয়া যায়।
দিন,মাস,বছর করে সময় বয়ে যায়। কবে,কখন যেন স্বামীর বাড়িটাই সে জায়গাটা নিয়ে নেয়। একদিন সে বাড়িটাই সবচেয়ে একান্ত আপন জায়গা হয়ে যায়। বাবা,মা ও বোঝেন। একসময় আর আগের মত আবেগপ্রবন হন না। অনুরোধ করেন বটে অভিমান করেননা, আমার না-সূচক যুক্তি শুনে চুপ করে যান।
জগতে সব সময় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে সন্তানেরা। বাবা-মায়ের জন্য আবেগ সেখানে পেরে ওঠে না পেছনে পড়ে যায়। বাবা-মায়েরা ভাবে তাদের সন্তানদের কথা। আমরা উদ্বিগ্ন থাকি আমাদের সন্তানদের ভাবনায়। কোনো এক সময় আমরা স্বার্থপর হয়ে যাই। আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা-মায়েরা হারটাকেই মেনে নেন। আর আমরা সন্তানদের কথা ভেবেই বাবার বিমর্ষ মুখ, মায়ের নির্বাক ভেজা চোখ উপেক্ষা করে যাই।
আমাদের সন্তানেরা বিদেশে থাকে। আমাদের দেশটাও ওদের বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নেই। ওরা অসুস্থ হয়ে পড়ে এখানকার আবহাওয়ায়। এত মানুষ, এত ধুলা-ধোঁয়া,এত গরম, এত আওয়াজ এত নোংরা পরিবেশ,এত দূর্নীতি চারদিকে। বাচ্চাদের ভবিষ্যত ভেবে এদেশে থাকাতে ওদের অনাগ্রহ। ওদের যুক্তি খুব সঠিক তবু, সব সময়ই ওদেরকে বিদায় দেবার সময় চোখের ভেতর দুঃখের নীল নদীতে বন্যা হয়ে যায়। ওদেরকে ছেড়ে আসার সময় গভীর দীর্ঘশ্বাস শিস দেয় বুকের হাড়ের ভাজে ভাজে।।
যদিও প্রতিবার ওদের বাচ্চারা বলে,”Good bye dadu. See you soon” “See you again” তবুও সহজে দেখা হওয়া এত সহজও না । এত ঘন ঘন আমারও যেমন যাওয়া সম্ভব না, ওরাও চট জলদি আসতে পারে না ! শুধু অপেক্ষার প্রহরই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।
বুকের দীর্ঘশ্বাস চেপে অবাক চোখে দেখি সবই তো চলছে দিব্বি এই আমাকে ছাড়া, সব সংসারে সবাই। কিছু তো থেমে যায় নি। জীবন তো এত কঠিন কিছু না। অথচ তুফানে তুফানে তছনছ হয়ে যায় একটা সাধের জীবন। তার জন্য দায়ী “মায়া” নামের শক্ত কঠিন এক শেকল। কোথা থেকে আসে যেন ছায়াঘন মেঘের মতন। আমরা নিজেরাই নানান অজুহাতে হাতে পায়ে পড়ে নেই এই শেকল। দিন যায়,মাস যায় এ শেকল জমে জমে হয়ে যায় বজ্র কঠিন।














