আগারগাঁওয়ের আলোয় দুই বন্ধু
মোঃ ইমন মিজি
মোঃ সবুজ হোসেন
ধন্যবাদ বন্ধু এত সুন্দর কাহিনী গল্প লেখার জন্য ।
অধ্যায় ১: অপ্রত্যাশিত আগমন
আজ সোমবার, ডিসেম্বরের এক শীত-সন্ধ্যার মৃদু কুয়াশা কেবল ঢাকা শহরের রাজপথে ডানা মেলতে শুরু করেছে। আমি, হতভাগা ইমন, আমার আগারগাঁওয়ের অফিসে বসেছিলাম। কাজ প্রায় গুটিয়ে এনেছি, কিন্তু মনের ভেতর একটা হালকা একাকীত্ব অনুভব করছিলাম।
হঠাৎ, আমার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠলো। নামটা দেখে ঠোঁটে হাসি ফুটলো – সবুজ।
“কী খবর, দোস্ত?” সবুজ, আমার সেই প্রাণবন্ত বন্ধু, ওপাশ থেকে বললো।
“আর বলিস না, অফিস এখন প্রায় ফাঁকা, একা একা বসে আছি। তুই কই?”
সবুজ হাসতে হাসতে বললো, “আমি তোর কাছে আসছি! আমার গাজীপুরের অফিস ১৬ই ডিসেম্বর উপলক্ষে তিন দিনের বন্ধ। ভাবলাম, এই সুযোগে এক টান দিয়ে তোর আগারগাঁওয়ের ডেরায় যাই।”
আমি চমকে উঠলাম। “কী বলছিস! গাজীপুর থেকে আগারগাঁও? এত দূর!”
“দূর আর কোথায়! মেট্রোরেল আছে না! আর তাছাড়া, বন্ধুর কাছে আসার জন্য কোনো পথই তো দূর হয় না। আমি প্রায় চলে এসেছি খালি একটু বলে দাও। এ বলাতে তারপরে বলে দিলাম উত্তরা হাউজ বিল্ডিং হতে দিয়াবাড়ি, উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশন, তার পরে আগারগাঁও মেট্র স্টেশন এসে কল দিবে, একটু পরে নামবো।”
আমার মনটা মুহূর্তেই ফুরফুরে হয়ে উঠলো। এই অপ্রত্যাশিত সৌজন্যতা আর আন্তরিকতা আমার একাকীত্বকে দূর করে দিল। সবুজের আসার খবরে আমার সাধারণ অফিসটা যেন মুহূর্তেই এক মিলনমেলায় পরিণত হলো।
অধ্যায় ২: বন্ধুত্বের ডাইনিং টেবিল
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবুজ এসে পৌঁছালো। দরজায় তার চেনা হাসি দেখে আমার ভেতরটা খুশিতে ভরে উঠলো। “আরে আয়, আয়! বস, বস! অনেক দিন পর একদম নিরিবিলি তোকে কাছে পেলাম।”
অফিসের একটা কোণার টেবিল, যেটাকে আমরা মজা করে ‘বন্ধুদের ডাইনিং টেবিল’ বলি, সেখানে আমরা দু’জন মুখোমুখি বসলাম। কাজের কথা নয়, কোনো প্রফেশনাল আলোচনা নয়—কেবলই দু’জন বন্ধুর হালকা কথাবার্তা।
“মেট্রোরেলে বেশ আরামেই আসলাম, দোস্ত। নামলাম, আর এখন তোর সামনে,” সবুজ বললো।
এরপর শুরু হলো আমার খাওয়ানোর পর্ব। তাড়াহুড়ো করে অফিস ক্যান্টিনের যা ছিল, তাই সামনে এগিয়ে দিলাম—কমবেশি কিছু মুখরোচক স্ন্যাকস, বিস্কুট। নিজের হাতে এগিয়ে-পিছিয়ে দিয়ে খাওয়ালাম, আমিও খেলাম। আমাদের খুনসুটি আর হাসি-ঠাট্টায় অফিসের গম্ভীর পরিবেশটা যেন ভেঙে খান খান হয়ে গেল।
সবুজ বললো, “আসছিলাম বন্ধুর কাছে আগারগাঁও মেট্রোরেলে। আর এখন বন্ধুর ডাইনিং টেবিলে বসে একটু খুনসুটি করা—এর চেয়ে শান্তির আর কী হতে পারে!”
গল্প-আড্ডার ফাঁকে আমি উঠে গেলাম। “দাঁড়া, আজ তোর জন্য স্পেশাল কিছু বানাচ্ছি।” নিজের হাতে বানালাম গরম কফি। সেই কফি নিয়ে এসে দু’জনের হাতে ধরিয়ে দিলাম। এই সামান্য কফি আর স্ন্যাকস, আর তার সঙ্গে আমাদের আন্তরিকতা—মিলিয়ে সন্ধ্যাটা যেন এক অমৃত পানীয়ের মতো লাগছিল।
অধ্যায় ৩: সন্ধ্যার ঘোর এবং আলোকিত প্রহর
ঘণ্টা দুয়েকের আড্ডা শেষে, যখন অফিসের প্রায় সবাই চলে গেছে, তখন আমরা দু’জন বের হলাম। শীতের সন্ধ্যায় আমাদের মনটা এমনিতেই ফুরফুরে লাগছিল।
“চল, একটু হেঁটে আসি,” সবুজ প্রস্তাব করলো।
আমরা পায়ে, পায়ে হেঁটে সামনে এগুতে লাগলাম। হালকা ঠাণ্ডা বাতাস আর শহরের ফিসফিসানি কানে আসছিল। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা বিশাল ভবনের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
“দেখ তো, এটা কী!” আমি ইশারা করলাম।
চোখ তুলে সবুজ দেখলো—বিশাল ভবনটি হলো নির্বাচন কমিশনার ভবন। আইসিটি ভুবন ডাক ভুবন চতুর্দিক ঘিরে সরকারি কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনের লোক পাহারা দিচ্ছেন। কিন্তু যেটা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো, তা হলো ভবনটিতে জ্বলে থাকা রঙের বে-রঙের লাইট।
আলো ঝলমলে সেই দৃশ্যটা শীতের সন্ধ্যায় এক অন্যরকম সৌন্দর্য তৈরি করেছিল। আমরা কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম। রাতের আলোয় ভবনটা যেন ঝলমল করছিল, আর সেই আলো আমাদের মনের ভেতরের আনন্দকেও যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
“অসাধারণ লাগছে রে,” সবুজ ফিসফিস করে বললো। “এই আলোতে মনটা ফুরফুরে হয়ে যাচ্ছে।”
অধ্যায় ৪: ফিরতি পথে পাওয়া
আলোর দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা ঘুরে আবার চলে আসলাম অফিসের দিকে। পরের দিন সবুজের ফিরতি ট্রেন ধরার সময় হয়ে আসছিল।
বিদায় নেওয়ার আগে সবুজ আমার হাত ধরে বললো, “দোস্ত, এই যে এতটুকু পাওয়া—তোর কাছে আসা, তোর হাতে কফি খাওয়া, আর তোর সাথে এই সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ের আলোকিত প্রহর দেখা—এর আনন্দটা অনেক।” তুই কবে যাবি বল আমি ছোট্ট করে বললাম ফোনে আলাপ হবে।
আমি হাসলাম। “আমারও খুব ভালো লাগলো, সবুজ। তুই না এলে সন্ধ্যাটা কেবল একা কাটতো। তোর আসা-যাওয়ার এই মাঝের সময়টুকুই আমাদের আসল প্রাপ্তি।”
সবুজ বিদায় নিয়ে মেট্রোরেল স্টেশনের দিকে পা বাড়ালো। আমি, হতভাগা ইমন, আবার অফিসের দিকে হেঁটে এলাম। অফিস এখন আবার নীরব। কিন্তু আমার মনটা আর একা নয়। বন্ধুর সৌজন্যতা, তার কাছে পাওয়ার উষ্ণতা আর আগারগাঁওয়ের আলোয় কাটানো সেই ফুরফুরে সন্ধ্যার স্মৃতি—সবকিছু মিলিয়ে এই ঘটনাটি আমার জীবনের সুন্দরতম গল্পগুলোর একটি হয়ে রইলো।














