
জাতীয় কবিতা পরিষদের নিয়মিত কবিতাপাঠ ও আলোচনা অনুষ্ঠানের ৫৪তম আয়োজন ১১ই নভেম্বর, মঙ্গলবার, বিকাল ৫ টায়, ২৬ ইস্কাটন গার্ডেন রোডের ‘কাজল মিলনায়তনে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হানের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত হয়।
‘মৈমনসিংহ গীতিকায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের উপস্থিতি’ শীর্ষক ব্যতিক্রমী আলোচনা উপস্থাপন করেন, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক ড. আকিমুন রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) কবি মঞ্জুরুর রহমান।
স্বাগত বক্তব্যে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি দ্রোহ, প্রেম ও প্রতিবাদের কবি মোহন রায়হান বলেন, আজকের আলোচক ড. আকিমুন রহমান পিএইচডি করেছিলেন, আমাদের প্রিয় শিক্ষক হুমায়ূন আজাদ স্যারের কাছে। পিএইচডি’র বিষয় ছিল ‘বাংলা সাহিত্যের আধুনিক বাস্তবতা’। তিনি আমার সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন। আকিমুন হয়তো জানে না যে, আমি তাকে কতটা জানি। আমাদের একটা গ্রুপ ছিল। তারা আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল, সাহিত্য করতে, কবি হতে ও রাজনীতি করতে। সে এক ছন্নছাড়া জীবন। যদি বলি আমাদের বন্ধু রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মঈনুস সুলতান, মঈনুল আহসান সাবের, সলিমুল্লাহ খান, আওলাদ হোসেন, আলী রীয়াজ, শাহাজাদী আনজুমান আরা মুক্তি, তুষার দাস প্রমুখ- আমাদের একটা ছন্নছাড়া গ্রুপ ছিল।
আমাদের ক্লাসে আহম্মদ শরীফ থেকে শুরু করে আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবুল কাশেম ফজলুল হক, সৈয়দ আকরম হোসেন, নরেন বিশ্বাস, হুমায়ুন আজাদ, সনজীদা খাতুন-এই সমস্ত তারকা খচিত শিক্ষকদের ক্লাসও আমাদের তেমন টানতো না। আমাদেরকে টানতো মধুর ক্যানটিন, শরীফের স্টল গফুরের স্টল, হাকিম চত্বর, টিএসসি, পাবলিক লাইব্রেরী, বটতলার আর রাজপথ। আমাদের অনেক মেয়ে সহপাঠী ছিল, তাদের মধ্যে ফাস্টক্লাস ফাস্ট ফাতেমা কাউসার, সেকেন্ড ফাস্ট ঝর্না রহমান, সেকেন্ড ক্লাস সেকেন্ড আকিমুন রহমান, এরা সবাই খুব সিরিয়াস ছাত্রী ছিলেন। এরা সবাই লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল। কিন্তু আমরা ছিলাম ফাঁকিবাজ। পড়ালেখা খুব একটা করতাম না। পড়ালেখা খুব একটা টানতো না। আকিমুন ছিল খুব চুপচাপ ধরনের। কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলতো না। সে ছিল হুমায়ুন আজাদ সারের ভক্ত। পরবর্তীতে তো হুমায়ুন আজাদ স্যারের কাছেই পিএইচডি সম্পন্ন করেছে। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে অনেকটা বছর। এরই মধ্যে আকিমুন রহমান দেশের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন। আমি অত্যন্ত গর্বিত এবং আনন্দিত যে ৪১ বছর পর আমি আমার সহপাঠি বন্ধুর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে পাশাপাশি আছি।
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আকিমুন রহমান তার আলোচনায় বলেন, আমাদের বিপ্লবী এবং আমাদের আশার কবি মোহন রায়হান। তার বক্তব্যের পরে আমার বক্তব্য দেওয়ার স্পর্ধা দেখানো খুবই দুঃসাহসের। তবুও আজ আলোচকের ভূমিকায় যেহেতু আছি সেহেতু একটু বলতেই হবে। ভীষণ বিস্ময় এবং ভীষণ সাহসী অর্থাৎ যাদের কাছে আমরা কখনো পৌঁছাতে পারবো না, অন্তত আমি পৌঁছাতে পারবোই না, তাদের নেতার নাম যে মোহন রায়হান। তিনি যে শার্টটি পড়তেন তার রং ছিল লাল। সে শার্টটি দেখে আমার সবসময় লাল গোলাপের কথা মনে পড়তো। তখন আমি খুব ভীরু-কম্পমান ও নিজেকে নিয়ে প্রচণ্ড হীনমন্যতায় ভোগা এবং নিম্ন মধ্যবৃত্ত চোখ দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম এবং স্যালুট জানাতাম তাকে। এত ভীত মানুষ আমি যে কখনো তাকে বলাই হয়নি আপনি আছেন বলে আমরা নিজেকে স্পর্ধাময় বলে মনে করতে পারি। মোহন রায়হান মানে সেসময়ের এবং চিরকালের অসামন্য দীপ্ততার ও অগ্নির নাম। সে সময় আমি পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রতি এতটাই ডুবে থাকতাম যে পাঠ্য বইয়ের প্রতি খুব একটা মনোযোগ দিতে পারতাম না। পাঠ্য বইয়ের প্রতি মনোযোগটা বাড়াতে পারলে হয়তো রেজাল্টা আরও ভালো করতে পারতাম।
আজকের আলোচনার বিষয় যেটা নির্ধারন করেছি তা হলো- ‘মৈমনসিংহ গীতিকায় রাষ্ট্রসংঘের উপস্থিতি।’ এখানে অনেকই আছেন যারা বাংলা সাহিত্যে লেখাপড়া করেছেন বা করেননি তাদের মধ্যে কম আর বেশি অনেকেই আছেন যারা বাংলা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে গেছেন। যেতে যেতে দেখছি ৯৫০ থেকে বাংলা সাহিত্যের আদি যুগের যাত্রা শুরু । সমালোচকগণ বা প্রবন্ধকাররা বলে থাকেন মধ্যযুগ হচ্ছে কেবলই ধর্ম নির্ভর, কেবলেই দেব-দেবীর স্তুতিমূলক সাহিত্য কর্মের একটা প্রচণ্ড রকমের সময় পর্ব । ঐ মনুষ্য মহিমার জয়-যাত্রা কদাচিত দেখা গেলেও সবসময় হচ্ছে দেব-দেবীর মহিমা এবং তাদেরই প্রবল প্রতাপের বিবরণ শুধু মাত্র প্রচীন মধ্যযুগের সাহিত্য পড়লে পাওয়া যায়। কিন্তু মৈমনসিংহ গীতিকাগুলো যেগুলো মধ্যযুগের। মধ্যযুগ শুরু হয়েছিল ১২০১ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত। মধ্যযুগের শেষভাগে মৈমনসিংহ গীতিকাগুলো পূর্ব মৈমনসিংহ অঞ্চলে অর্থাৎ নেত্রকোণার ও মুন্সিগঞ্জ এলাকায় মুখে মুখে রচিত হয়েছিল তার প্রেক্ষাপট ছিল শুধুমাত্র নারীর প্রেম, প্রেম এবং প্রেম কতভাবে জীবনকে আত্মত্যাগের দিকে, আত্মোৎসর্গের দিকে নিয়ে যেতে পারে, ঠেলে দিতে পারে তারই বিবরণ মৈমনসিংহ গীতিকায় উঠে এসেছে। মধ্যযুগ নিয়ে কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু পিএইচডি করার সময় পিএইসডি গাইড আমার সরাসরি শিক্ষক হুমায়ুন আজাদ স্যার ভীষন রকম আধুনিক মনস্ক ছিলেন। তিনি মধ্যযুগকে খুব একটা পছন্দ করতে না। ফলে তখন মধ্যযুগ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ হয়নি। আমরা সবাই জানি মৈমনসিংহ গীতিকার লেখক দীনেশচন্দ্র সেন। ১৯২৩-৩২ সালে ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন এই গানগুলো অন্যান্যদের সহায়তায় সংগ্রহ করেন এবং নিজস্ব সম্পাদনায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশ করেন। ময়মনসিংহ গীতিকায় যে শুধুই প্রেমের জন্য জীবন ত্যাগ করা বা আত্মোৎসর্গ করার নিদর্শন দেখা যায় তেমনটা নয়। এখানে নানানভাবে সামাজিক প্রতিপত্তিশালীগণ রাষ্ট্রীয়ভাবে যারা ক্ষমতায় আছেন পদাধিকারীগণ এবং তাদের হিংস্রতা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষের জীবনকে কতভাবে তছনছ করে দিয়েছেন। নিষ্পেসিত ও নির্যাতিত মানুষগণ যন্ত্রনায় বিচার না পেয়ে একেকজন তাদের সামাজিক জীবন ও পরিবারিক জীবন ধ্বংসগ্রস্থ হতে দেখেছে ফলে মৃত্যুকে অবলিলায় বরণ করে নিয়েছে। এটা শুধুমাত্র প্রেমকে বা প্রেমের জন্য নিজেকে বিসর্জন দেওয়ার আখ্যান নয়, এটার ভিতরে প্রবল রকমের রাষ্ট্রীয় অনাচার, অন্যায়, অত্যাচার ও শোসনের ভয়াল বাস্তবতা ধারণ করে আছে। ফলে আঞ্চলিক বা সামাজিক সংঘাতে রাষ্ট্রসংঘের সরাসরি উপস্থিতি মৈমনসিংহ গীতিকার বিবরণে আমরা দেখতে পাই।”
জাতীয় কবিতা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সেমিনার বিষয়ক সম্পাদক কবি মঞ্জুরুর রহমান বলেন, যে বিষয়টি আমাদের গর্ব করার তা হলো পূর্ব বঙ্গের সাহিত্য। আজকের আলোচক যে বিষয়ের উপর আলোকপাত করলেন, সেখানে মৈমনসিংহ গীতাকার চারটি উপাখ্যান সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করলেন এবং এর ভিতরে যে সমাজ বাস্তবতা আছে সেটিকে নিবিড়ভাবে তুলে ধরলেন। বাংলা সাহিত্যে সমস্ত মধ্যযুগজুড়ে যে মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছিল সেটিও শেষের দিকে এসে ভারতচন্দ্র রায়ের প্রথম আত্মিকতা হিসেবে গণ্য করা হয়। যেখানে দেবীর কাছে একটি বাক্যে প্রার্থনা করা হতো- ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। এখানে একজন মায়ের যে আকুতি এক বাক্যের মধ্যদিয়ে তা দেখতে পাই। পূর্ব বাংলার সাহিত্য সেটি দেব দেবীর কাহিনী বা স্তুতি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এসে পূর্ব বাংলার নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও মৈমনসিংহ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক বাস্তব চিত্র এখানে দেখতে পেলাম। মৈমনসিংহ গীতিকার সৃষ্টিশীল বায়ানে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে মানুষের যে আবেগমথিত কাহিনীর গাঁথনি উপস্থাপন করা হয়েছে তা অত্যন্ত চৎকারভাবে আলোচক ড. আকিমুন রহমান তুলে ধরলেন। ”
আলোচনা শেষে কবি মোহন রায়হান, কবি মঞ্জুরুর রহমান, কবি মুস্তাফা মজিদ, কবি ইউসুফ রেজা, কবি ক্যামেলিয়া আহমেদ, কবি শাহীন চৌধুরী, কবি রোকন জহুর, কবি মনিরুজ্জামান রোহান, কবি শিমুল পারভীন, কবি জেসমিন আরা পারভীন, কবি বাবু হাবিবুল, কবি মিলি হক, কবি জয়নুল আবেদীন জয়, কবি আতিকুল ইসলাম, কবি ফারুক প্রধান, কবি সবুজ মনির, কবি মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান, কবি ইমরুল বাবু, কবি তাসকিনা ইয়াসমিন, কবি কাব্য রাসেল, কবি কামরুজ্জামান, কবি কৌমুদী নার্গিস, কবি ইমরুল কায়েস, কবি ফারহান উদ্দিন, কবি মোহাম্মদ আলী, কবি আবু হেনা মোস্তফা এনাম, কবি কামাল ফরিদ, কবি আব্দুল্লাহ আল মাসুম, কবি ইসমত মির্জা, কবি রানা জামান, কবি দেলোয়ার হোসেন, কবি রকিব লিখন, কবি রাকিব ফরায়েজী, কবি শরীফ খান দীপ, কবি আতিকুজ্জামান খান, কবি প্রভাবতী চক্রবর্তী, কবি রোকসানা খাতুন, কবি রাসেল আহমেদ, কবি উত্তম কুমার চক্রবর্তী, কবি শিশির বিন্দু বিশ্বাস, কবি আফিয়া রুবি, কবি সৈয়দ খাইরুল আলম, কবি জহুরুল ইসলাম মঞ্জু, কবি রবিউল আলম, কবি গাজী গিয়াস উদ্দিন, কবি মরিয়ম আক্তার, কবি আউয়াল খন্দকার, কবি মুরাদ আল হাসান, কবি টিমুনী খান রিনোসহ পঞ্চশাধিক কবি স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন কবি ক্যামেলিয়া আহমেদ, কবি মনিরুজ্জামান রোহান, কবি কাব্য রাসেল ও কবি নাহিদ হাসান।
মনিরুজ্জামান রোহান
প্রচার সম্পাদক
জাতীয় কবিতা পরিষদ
















