প্রথম অধ্যায়: কর্মব্যস্ত দিন ও আকস্মিক ডাক
শহরের কোলাহলে মিশে থাকা এক তরুণ, নাম আকাশ। কাঁধে তার ব্যাগ, ব্যাগে সাজানো বাংলালিংক সিম আর বিজনেস প্যাকেজের ঝকঝকে প্ল্যান। আকাশ একজন পরিশ্রমী যুবক। তার জীবিকা চলে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সিম বিক্রি করে, নতুন সংযোগ দিয়ে। তার কাছে কাজ মানেই উপাসনা, আর পরিশ্রমের ফসলই তার একমাত্র পাথেয়।
সন্ধ্যা নামার সময়। আকাশের দিনের শেষ ভাগ। নিকেতন এলাকায় তখনও তার দুটি সিম অ্যাক্টিভ করার কাজ বাকি। ঘড়ির কাঁটা যখন ঘোর ঘোর সন্ধ্যার দিকে ইঙ্গিত করছে, ঠিক তখনই বন্ধু রিপন-এর কল।
“কিরে আকাশ, কোথায় তুই? আসবি কখন? আমি তো আছি নিকেতন,” রিপন বলল।
আকাশ বলল, “আর দুটো সিম আছে, অ্যাক্টিভ করেই চলে আসব। চিন্তা কইরেন না।”
আকাশ দ্রুত কাজ সেরে হাঁটা শুরু করল। সাততলা নামে পরিচিত এলাকাটির মাঝামাঝি দিয়ে তার ফেরার পথ। রাস্তার ধারে সারি সারি দোকান, যেখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের কাজের ফাঁকে অলস আড্ডা জমিয়েছেন। আকাশ সেখানে পৌঁছাল, তার উদ্দেশ্য ছিল উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বিজনেস প্যাকেজের সিমের অফার দেওয়া। কিছু দোকানে সে প্যাকেজ ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়: ভুল বোঝাবুঝির কালো মেঘ
হঠাৎ একটি দোকানের সামনে একদল লোককে জটলা করে বসে থাকতে দেখল আকাশ। তারা নিজেদের মনে গল্প করছিল। আকাশকে দেখে তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে থামিয়ে দিল।
“ভাই, আপনার কাছে কি ওয়ান সিরিয়ালের নাম্বার আছে?”
আকাশ মাথা নেড়ে জানাল যে, তার কাছে বিভিন্ন সিরিয়ালের সিম আছে। সে সিমের ডেমো দেখাতে ব্যস্ত হলো। ঠিক সেই সময়, দোকানদারদের একজন হুট করে তাদের সরিয়ে রাখা একটি ফোন দেখতে না পেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
“এই যে ভাই, আপনি আমাদের ফোন নিয়ে গেছেন! আমাদের ফোন কই?”
আকাশ একেবারে হতভম্ব। তার মাথা কাজ করছে না। “আপনারা হঠাৎ কী বলছেন? আপনাদের কি মাথা ঠিক আছে? আমি ফোন নেব কেন? আপনারা ভুল বলছেন! আপনারা ভেবেচিন্তে দেখুন ফোনটি কোথায় রাখছেন! হট করে আমার নাম দিচ্ছেন কেন? আপনারা কি আমাকে চেনেন? না বুঝে, না শুনে আপনারা আমার ওপর দোষ চাপাতে পারেন না!”
কিন্তু তার কথায় কান দিল না কেউ। দোকানদার আর তার সঙ্গীরা দলবদ্ধভাবে এগিয়ে এল। তারা যেন মনের ভেতরের ক্ষোভ আর সন্দেহ মিশিয়ে একজোট হয়ে আকাশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা একা পেয়ে আকাশকে ঘুম ঘাম মারধর করতে শুরু করল। তার কলার ধরে টানল, জামা ছিঁড়ে ফেলল। নির্দোষ এক যুবকের ওপর এমন আক্রমণ দেখে আশপাশের কিছু লোক জড়ো হয়ে গেল। জায়গাটির নাম সাততলা, আর সেই সাততলাতেই ঘটল এই কলঙ্কজনক ঘটনা।
তৃতীয় অধ্যায়: বিশ্বাসের দৃঢ়তা ও ভাইব্রাদারদের আগমন
আকাশ মার খাচ্ছিল, কিন্তু তার মনোবল ভাঙেনি। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস, সে এই ভুল করেনি। সে পরিশ্রম করে খায়, পরিশ্রমের ফল ভোগ করে। কখনো কারো জিনিস তুলে নেওয়ার আগে সে ভাবি, “এটা কি আমার?” এই নীতিতে সে বিশ্বাসী।
কিন্তু জনতা তো আর সবটা বোঝে না। তারা শুধু দেখছে মারধরের দৃশ্য।
ওদিকে, মহাখালী তিতুমীর কলেজে আকাশের ভাই-ব্রাদারদের কাছে এই খবর পৌঁছাতে দেরি হলো না। রিপন এবং ছোটন-সহ কলেজের যুবকরা যেন চিলের মতো উড়ে এসে হাজির হলো সাততলায়। তারা এসে দেখে, মারধরের ফলে আকাশ গুরুতর আহত।
রাত্রি তখন প্রায় বারোটা পার। রিপন আর ছোটন আহত আকাশকে ধরে নিয়ে একটি বড় নারকেল গাছের ধারে দাঁড় করিয়ে রাখল। সেখানে এলাকার কিছু ভালো মানুষ, মা-বোনেরা জড়ো হলেন। তাঁরা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন। তাঁরাই প্রথম বললেন, “ছেলেটির কোনো দোষ নেই, ছেলেটি ভালো। বেয়াদব নয়।”
চতুর্থ অধ্যায়: সালিস, জরিমানা ও চিকিৎসালয়
এই গুরুতর পরিস্থিতি দেখে পুলিশও সেখানে চলে আসে। এলাকার একজন চেয়ারম্যানও উপস্থিত হন। পুলিশ আসার পরও চেয়ারম্যান স্থানীয় লোকজনের কথায় কান দিয়ে আকাশকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি ফোন নিয়েছো?”
এবার আকাশের সংযমের বাঁধ ভাঙল। “আপনি মুখ সামলে কথা বলবেন!” আকাশ চিৎকার করে উঠল। “আপনি কি জানেন না শুনে, চার-পাঁচজন আবোল-তাবোল ছেলে-পেলের কথা শুনে আমাকে দোষারোপ করছেন? আপনি ওদের জিজ্ঞেস করেন যে, ‘তোরা একটা চূড়ান্ত পাকামি করেছিস, এর জন্য তোদের প্রাপ্য কী?'”
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মারধরের সত্যতা প্রকাশ পেলে, পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিল। তারা মারধরকারীদের চার-পাঁচজনকে ধরে নিয়ে গেল এবং ৳10,000 জরিমানা করল। পুলিশ তখন চেয়ারম্যানকেও শান্ত থাকার নির্দেশ দেয়।
রিপন এই সময় দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। মারধরের পর সে আকাশকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, “আকাশ, এটা পত্রিকায় উঠবে না। এর ছোট সামান্য বিষয়টা আমরাই সামলে নেব। এটা জানা জানি হয়ে যাবে না, পত্রিকা-টেলিভিশনে চলে যাবে না।” তবে ততক্ষণে পুলিশ পরিস্থিতি গুরুতর বুঝে নির্দেশ দেয়— “উনাকে আপনারা ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যান।”
সিএনজি-যোগে দ্রুত আকাশকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
পঞ্চম অধ্যায়: সুস্থতার পথে ফেরা
ঢাকা মেডিকেলে দীর্ঘ সিরিয়াল। রাতভর অপেক্ষার পর আকাশ ডাক্তারের কাছে পৌঁছাল। ডাক্তার প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। এরপর রিপন আর ছোটন মিলে ওষুধ কিনে আনল।
ভোরে, আহত আকাশকে সঙ্গে নিয়ে রিপন আর ছোটন বাসার পথে ফিরল। আকাশের শরীর ব্যথা, কিন্তু তার মনে কোনো গ্লানি নেই। তার চোখে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়—সে নির্দোষ। একটি ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে সে যে শারীরিক ও মানসিক আঘাত পেল, তার মূল্য সে পরিশ্রম দিয়ে শোধ করবে। তার বিশ্বাস, পরিশ্রমের সততা কখনো ব্যর্থ হয় না। সাততলার বিভীষিকা হয়তো তাকে আঘাত করেছে, কিন্তু তার কর্মের পথে কোনো কলঙ্ক দিতে পারেনি।
















