ঘুমভাঙা সকালের মৃদু হাওয়ায় শরীরের ভাঁজগুলো ঝরঝরে হয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে দেখা গেল নুয়ে পড়ছে দক্ষিণের আকাশ। ভারিভার্তুক আকাশ, কালো রঙের স্তুপে ভেঙে ভেঙে পড়ছে। গাছগুলো দাঁড়িয়ে, খণ্ড খণ্ড মেঘ দিকভ্রান্ত, নীড় ভাঙা পাখির মতো উড়ছে গাছের ছায়ায়। গাছগুলো পুড়ে গেছে, আগুন নিয়ে দৌড়ে এসেছে বানরদের দল, তিব্বত মালভূমি থেকে সিন্দু সাগরের পাড়ের দেওদারের গাছে পূর্বপুরুষের বাস ছিল, তাড়া খেয়ে চলে গেলেও রয়ে গেছে কতেক বানর। নদীর ওপারে পুরাতন বাজার, টিনগুলো মরচে রঙের, লেজ নেড়ে নেড়ে বানর ছুটছে এবং দু একটা লাফাচ্ছে। ঝনঝনিয়ে উঠছে টিনের চাল। বিস্ময় চোখে দেখছেন ফিদেল কাস্ত্রো। এদেশে এতো বানর কেন? বানরের দেশ দেখে দুচোখ লাল হয়ে উঠেছে তাঁর। মানুষ গজিয়ে ওঠা দেশে বানরের বংশ বৃদ্ধি পেয়েছে দেখে হতাশ হয়ে গেলেন। মনে হচ্ছে পুরাতন বেশে মানুষে ফিরছে আবার।
ভাঙাস্তুপের পাশ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ফিদেল কাস্ত্রো। পুরনো অভ্যাসের বশে সিগেরেটের পিতনাভীটা চেপে ধওে বারবার। শুকোর মাথাতে কাঠি খোঁচা দিতেই সাদা মেঘের মতো ধোঁয়া উড়তে লাগলো। চকের লেখার মতো ডুবে যেতে লাগল কালো কালো মেঘ। বাহ্! কী অপূর্ব ভূমি। দিনের আলো ও পথের বাঁকগুলো দেখে মনে হয়। অন্য এক দুনিয়ার পথ দেখছে। পথের বাঁকে বাঁকে সূর্যটাও ধীরে ধীরে হাঁটছে। ভূমিষ্ঠ শিশুর গায়ের রঙের মতো সাদা হয়ে ঘনিয়ে আসছে জ্বলজ্বলে রোদের দুপুর, দিনের আলো কাস্তের মতো থুবড়ে পড়ছে মাড়ভাতে আচ্ছন্ন দেশের মানুষের মুখে , জোছনাঝরা হাসিটা মিইয়ে গেছে। বুঝতে পারে না–কষ্ট হচ্ছে কোথায়Ñ হাঁটতে এলেন ফিদেল কাস্ত্রো। ভোরে বৃষ্টি হয়েছেÑ ভেজা ভেজা পথ। দলবেঁধে মানুষ নামতে শুরু করেছে। ধ্যানীপুরুষ, মুঠোবন্দি হাতে ধুঁকতে ধুঁকতে ভরা জলাশয়ের পাশে একরোখা হয়ে দাঁড়ালেন ফিদের কাস্ত্রো। চোখজোড়া নিহরে দুপাশের খোলা পথ দু দুবার দেখলেন। নগরব্যস্ত মানুষের মুখ শুকনো শুকনো, তবুও ছুটোছুটি করছে। কারো হাতে ব্যাগ, কারো হাতে প্রেস্ক্রিপশন, কারো হাতে রক্তঝরা বাবার শেষ ছবিটা দুলছে। স্বপ্নঝরা চোখ, যার বাবা ছিলেন বৃক্ষ, আগলে রেখেছে তাকে। আজ সব শুন্যের দিকে। স্মৃতিময়ী দিনের জ্বলন্ত মানুষ। বাবা কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, কী টেনশন করো আজোয়ান? বাবার নিশ্বাস আছে, বেঁচে আছি এখনো। স্বপ্নের দরজাও খোলা। বাবা নেই , শুন্য ঘর , ফাকা মাঠ , ভিড়ের মধ্যে শুধু বাবা নেই। নিঃসঙ্গতার রাতদিন। বাবার অপূর্ণ ইচ্ছের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে ধুকরে ধুকরে কাঁদছে আজোয়ান। কর্মব্যস্ত নগরীর কাঁধে অসংখ্য মানুষ। পথচারির থুবড়ানো মুখ, প্রাচীরের মতো জটলা দেখা যায়। অফিস ফেরত মানুষগুলো দ্রুতবেগে যাচ্ছে। আতঙ্কভরা চোখ -মুখ ও পেছনফেরা দৃশ্যটাও। এতো ভয়ে কেন মানুষ? কী হয়েছে মানুষগুলোর। এতো ভয় কেন চোখে। কী দেখছে লোকগুলো? কোন জমদূত নাকি অন্ধকার? নাকি অপরাধী? কী হয়েছে এদের। এতো ব্যতিব্যস্ত কেন? আজোয়ান দূরে দাঁড়িয়ে, তাকে পার হয়ে এসেছে ফিদেল কাস্ত্রো। অচেনা মানুষ সব , শহরের গলিতে নতুন সে।
পাশ ঘেঁসে দাঁড়ায়ে একজন, ভাঙা কণ্ঠ তাঁর, স্বর ওঠে না, জোর করে ডাকলেন। ছেলেমানুষ, উঠতি বয়সী ছেলে। দাঁড়ি গোঁফ এখনো ঠিকমতো গজায়নি। একটু উঠে উঠে মনে হচ্ছে। পোড়াবাড়ির পাতার মতো, ত্যাজ নিয়ে উঠেছে বুনোঘাস। দশ হাত দূরে ছেলেটা। দশ পা হেঁটে গেলেই তার পায়ের ছাপ, ইচ্ছে হলে কাছাকাছি চলে আসতে পারে কিন্তু আসে নি। কেমন আতঙ্কভরা চোখ, তার মাঝেও ভয় আছে। কিসের ভয়, ভয়ের মওসুমে মানুষ পিঁপড়ে দেখলেও বাঘ মনে করে আজকাল। কিসে যে ভয় জানা মুশকিল, বাঘে নাকি মানুষে, কে মরতে চায়।
বাঁচতে গর্জন দেয়। মৃত্যুর ভয় কার না থাকে। মাথার ওপর ছোটো ভরা টুপরি, বেশ ভার আছে , কী সব জিনিসপত্র নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। টুপরিটা রেখে কাঁপাকাঁপা গলায় ছেলেটা বলল, স্যার আমাকে একটু যেতে দিন না, হে পারে মেঘ ধরছে, নদীতে জলের গর্জন, তাড়া অঅছে খুব । টুপরিটা রেখে না গেলে বাজানের কাছে কী জবাব দেবো আমি। যাওনই লাগবে আমার।এক্ষুণি যাওর লাগবো, এক্ষুণি! খিটখিটে মেজাজ অফিসারের।কথা বললেই দাঁতমুখ খিঁচে ওঠে। এখনো জোর কণ্ঠ, চোখ রাঙিয়ে বলল, ওই ছেলে কে তুমি? এতো সাহস তোমার, কোথায় যাবে? ভয় নেই আজোয়ানের। কীসের ভয় , গোষ্টির কেউ ভয় পায় না । এসব তো ছাইমাটি সুতরাং আঙুল উঁচিয়ে বলল, ওই যে, ওই বাড়িতে। বাড়িটা ভাঙা ভাঙা এবং খসে পড়ছে। দেয়ালের সুরকিগুলো মৃদুল হাওয়ায় দুলছে। মানুষের দেখা নেই। তবুও সেখানে কেন যাবে ছেলেটা। এতটুকু প্রশ্ন জাগে মনে । ওই ছেলে , সেখানে তোমার কে থাকে? এবং কেন যাবে?
প্রশ্নের উত্তর দিবে কী ছেলেটার চোখজোড়া জলে টইটুম্বুর। দম আঁটকানো, তবুও বলল, আমার কেউ না? তবে আমাগোই মানুষ, খুব আপন মানুষ। কাস্ত্রোর চোখজোড়া পর্বতের মতো দীর্ঘ ও উঁচা হয়ে গেল। ভ্রুরেখায় চরের সিঁথির মতো ভাঁজ পড়ছে। একটু ঘেঁসে জিজ্ঞেস করে -তোমার নিবাসা কোথায় এবং এসেছো কেন? ছেলেটির কথায় কোন বাঁকঝোঁক নেই। সোজা বলে ওঠে মধুমতি নদীর ওপার থেকে। কোথায় মধুমতি? নিশ্চয়ই নদীটি দেখতে সুন্দর ও নয়নজুড়ানো যৌবনা নদীর বুক। নদী তো আমাগো মায়ার নাম, নদী না থাকলে আমরা বাঁচি কেমনে? নদীই আমাগো বাঁচামরা। পদ্মার পর বিশাল নদী, নদীর ওপর লম্বা ব্রিজ। তার পরে ছোটো গাঙ, ওটার নামই মধুমতি। আগে নৌকায়, ও ট্রলারে আইতাম। এখন তো সোজা সোজা পথ, গাড়িতে উঠলেই এপার আবার ওপারের পথ। বেশি সময় লাগে না। শুধু নাম লইলেই ওয়। ওওে বাপ! আপসি কোন দেশি মানুষ! কী জিগাইলেন মাথায় ধরে না। চোখজোড়া হাসিতে ঝকঝক করছে ছেলেটার। কথাগুলো বলার সময় খুব উৎসাহ থাকলেও হঠাৎ একটু দমে গেল। কদিন ধরে বাবা আড় ধরলেন। নিজে নিজে হাঁটতে পারেন না ; পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে, মরা থেকে উঠে এসেছে ঠিক কদিন আগে। মৃত্যুদূত এসে খবর দেয়, সময় ঘণিয়ে এসেছে গুছাও সব গুছাও- যেতে হবে – জলদি রেডি হও। তখন ভয় হতো কারণ বাবা খুব ভয় দেখাতেন। চোখ বড়ো করলে কার না ভয় লাগে। তবে মনে হতো মাঝে মাঝে বাবা বহস করতেন, কী বলতেন জানি না। তবে এটুকু বুঝতাম , আমি প্রস্তুত তবে শহর ঘুরে আসি– তারপর এসো। এটুকু অন্তত দেও। বহসের পর কদিন সুস্থ ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বাবা আর আসতে পারলেন না, চলেই গেলেন। দুনিয়া ছাড়া নেই অচেনা পথে । যেখানে তার বাপ-দাদার কবর। মরার আগে আমাকে ওসিহত করে গেলেন । আমি বাবার কথা ঠেলতে পারি কী? সততো গুরুজনের কথা। আরেকেতো বাজান, কারণ বাবা তো কেবল কইতেন, গুরুজন সংসারের বাপ, গুছিয়ে দিয়েছে আমাদের অগোছালো সংসারটা, অন্যের দখলে থাকা জমিনগুলো, সব আলাদা, কারো কাছে এখন আর মাথা নোয়াতে হয় না, কেন নোয়াবো? সব তো পেয়েছি। বাবার হাতে তৈরি সংসার? সংসারের সব খুঁটি তো বাবার হ্াতে গড়া, মানুষগুলোও ভালো ছিল, কত মানুষ বাবার কথামতো দৌড়ে আসতো। যাক মানুষের আসা যাওয়া আর কী হবে। বাবার হুকুমটা তামিল করা লাগবে তাই ছুটে এলাম। মনোযোগী শ্রোতা। ভাজ পড়েছে তার কপালে , ছেলেটার টুপরিতে হাত রেখে বললেন , টুপরিতে কী? বাজানের কথা ছিল, অমান্য করে ফায়দা নেই। নিজের গাছের সবজি কলা ও নারকেল নিয়েছি। বাবা নিজ হাতে রুয়ে গেছে গাছগুলো। জিনিসগুলো খুব তরতাজা। ছেলেটার বয়স আঠারো পার হয়নি। কাছাকাছি হবে হয়তো। গালচাপা ভাঙা ভাঙা। হাসলে ভাঙা গাছের গুড়ির মতো দেখা যায় । চেঁড়া পাতার মতো মুখটুকু শুকনো ও খসখসে। কিন্তু কতদূর ছাপিয়ে এ বাড়ির সম্মুেখে এসে অপেক্ষা করছে। কেমন যেন করছে? কী টান এ বাড়ির প্রতি। বুঝা মুশকিল।
গাড় নীল রঙের পোশাকী লোক ধমকাতে ধমকাতে দৌড়ে এলো। টুপি ও হাতের অস্ত্র দেখে মনে হলো এদেশের পুলিশের লোক। কী আজব সম্মুখের লোকটা হাত চেপে ধরে ছেলেটার। টুটি ধরে টান দেয় এবং বলল, কানে যায় না কথা? যাস্ না ক্যান। খুব পিরিত না। পাছা চ্যাপড়াবো তখন টের পাবে। কদিন আগে পুলিশের পোড়া লাশ গাঙে ভাসতে দেখেছে ছেলেটা, শহরে ঢুকার মুহূর্তে উল্টোপাশে গাড়িঠাপানো লোকটাকে ধরতে গেলে লোকটা পুলিশের কলার চেপে ধরেছে। কী নাস্তানাবুদ! সে পুলিশ ধমকাচ্ছে তাকে আজ। দেশে আইনের শাসন ফিরে এসেছে বোধ হয়।
ভয়! চাকরি হারানোর ভয়! হয় বাড়িতে বাবা আছে কিংবা নতুন বিয়ে করা সংসারের বউ বাচ্চা পেটে ধরেছে। নচেৎ কোন মানুষ এমন আচরণ করে। হঠাৎ মাঝখান থেকে কম বয়সী পুলিশ এসে টুপরিটা জলে ছুড়ে দেয় এবং ছেলেটার গাড় টান দিয়ে বলে, আর আসবি? বাবা বাবা করে চিৎকার করে ছেলেটা। ওই তোর বাবা কে? বুকের ছাতিম টাঁটা সাহস ছেলেটার। মাথা উঁচু ও বুক টান করে কয় ওই বাড়ির লোক জানে! কাস্ত্রো থমকে গেলেন, একী কাণ্ড? কী দোষ ছেলেটার। এভাবে মারছে কেন? কী অপরাধ! টানতে টানতে ছেলেটাকে ওরা নিয়ে গেল। আহ! ছেলেটার নামটা জানা হলো না।
ফিদেল কাস্ত্রো সিগেরেট ধরায়ে দুটান দিয়ে দক্ষিণে মুখ উঁচু করে ধোঁয়া ছাড়লেন। দুজন কনস্টেবল কএধ কাঁধ মিলিয়ে যাচ্ছে – আর ফিসফিসিয়ে বলছে। ছেলেটার দম আছেরে। এতো মার খেয়েছে তবুও বলছে এই বাড়িটা। কী আছে এই বাড়িতে। ইট সুরকির ভেতরেও শক্তি,
ভাঙা, কিচ্ছু নেই তবুও… আরেকজন কয় মনে হচ্ছে ইতিহাসের শক্তি। যা বলিশ না কেন, এভাবে মারা ঠিক হয়নি। কয়েক টান শেষে সাদা রঙের একজন নারী দেখতে পেলেন। ভিনদেশী মানুষ । সংবাদকর্মী হবে হয়তো। দেশের নয়। বিদেশ বৈভব থেকে এসেছে। কিন্তু চেহারাটা খুব চেনা চেনা, আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল মেয়েটা। নামটা ঠিক মনে পড়ছে না এখন আর। ক্ষমতার মসনদে থাকলে কতজন আসে, কত কথা জিগায়, এখন তো মানুষের মধ্যে মানুষ। কী আর জিগাইবো চিনবেইনা হয়তো? খুব দেরি নয় কদিন পূর্বে আমার কাছে একজন সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল তখন আমি দুটো লাইন বলেছিলাম।
আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব এবং সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়”
তাঁর এখানে কী? কেন এসেছে। মনে হচ্ছে বাড়িটির দিকে যাবে। রিকশা থেকে নেমে পা টিপে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটি। আমার দিকে নজর পড়েছে তাই চেনার চেষ্টা করেছে বারবার কিন্তু ধোঁয়ার কারণে মুখটা পেছনে পড়ে যায়। পেছন থেকে রিকশায় বসা দুজন বলল, হায় কী সর্বনাশ!এখনো ধোঁয়া উড়ছে। কী বাড়িরে বাপ! দম আছে বাড়িটার। বাঁ পাশের জন বলছে। গেঁথে যাওয়া মানচিত্র কী সহজে মন থেকে মুছে যায়। ওই দেখো মানচিত্র উড়ছে। স্বাধীনতার চাহনি ক্ষয়ের চেষ্টা, জ্বলসে গেছে সব তবুও হাওয়ায় উড়িছে। উতরিয়ে উড়ছে ধোঁয়া, বিশহাত উপরে উঠেই মানচিত্র হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় পতাকার পাশে পায়চারি করছে। মনে হচ্ছে বাড়িটা একখণ্ড আকাশ।
দক্ষিণ পাড়ে বসা একজন ভদ্রলোক। মৃদু মৃদু স্বরে গান ধরছেন। সুরেলা কণ্ঠ। দুচারটে মধ্যবয়সী মেয়ে খুনসুটি করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে আর তার দিকে আড় নজর দিয়ে হাঁটছে লোকটা। কারো গতিও থেমে যাচ্ছে। যাক লোকটার পাশে এসে শরীর হেলিয়ে বসে কাস্ত্রো। একজন গান গায় অন্যজন স্থির হয়ে শোনে। চোখ বন্ধ করে গানের আসর চলছে দুজনের। গলা শুকিয়ে এলো শিল্পীর। একটু পানি চায়। কোথায় পানি পাবে। দূরে একটা ছেলেকে দেখা গেল। কণ্ঠ উঁচু করে ডাক দেয়। দ্রুত ছেলেটা বোতল দিয়ে বলল, স্যার জলদি টাকাটা দেন। পুলিশ ধরবে। সব নিয়ে যাবে। কেন? এখানে আসা নিষেধ। ঢুকতে দেয় না। আপনারা বসে আছেন কেন বেশিক্ষণ থাকলেই মাইর দিবো। এই বয়সে মাইর খাইবেন? আপনাগো ঢর করে না ; কেন আসছেন? কি বলে ছেলেটা আজব তো আমাদের মারবে কেন? আমরা কী করেছি। স্যার ওই যে, আসে দেন দেন জলদি দেন। শিল্পী টাকাটা বের করে দিতেই ছেলেটা দৌড়ে পালিয়ে গেল।। পানি দু ডোক খেয়ে সে কাস্ত্রোকে দেয় এবং ঠায় তাকিয়ে বলল, হেনরি কিসিঞ্জার তুমি এখানে? একই প্রশ্ন আমারও তুমি কেন? এই বাড়িতে যাবো। চলো চা খেয়ে আসি কতদিন দেখা হয়নি। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। বাড়ির সম্মুখে দাঁড়িয়ে দেখলো শহরের ধূলো নয় ভাঙা সুরকির ধূলো উড়ছে। তবুও সামনে গেল। ভাঙা, বাড়ির সবকটা কক্ষ খুপরির মতো ভাঙা, দরজা জানালা একটাও নেই। টর্নেডো গেছে মনে হয়!কাস্ত্রো মোবাইলটা বের করে ছবি তুলতে লাগলো। কিসিঞ্জার ভিডিও করতে করতে সিঁড়ির গোড়ায় এসে দাঁড়াতে দু চোখের জল উপচে পড়তে লাগলো। বাঁধভাঙা জল। আরও কয়েজন লোককে দেখা গেল। চোখ টিপে টিপে কাঁদছেন। খুব কাঁদছেন। চোখে জলাধার কতক্ষণ আটকে রাখবে আর, পড়ো পড়ো জলের ফোঁটা, ফুঁফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছেন।
কাস্ত্রোর কান্না এলো না বরং দুচোখে আগুনের ত্যাজ বইতে লাগলো। পুলিশ দৌড়ে এলো। শহলে এখন পুলিশ শুধু দৌড়ই দেয়। প্রতিদিন জনতা আর পুলিশের দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। ডানে বাঁয়ে কতক্ষণ পরপর দৌড়ের ওপর থাকেকিন্ত ঠকে। এখনও দৌড়ে এল পুলিশ। কাস্ত্রোকে বলল, ওই ভিডিওটা কাটেন.. কাটেন। কাস্ত্রো মোবাইলটা বন্ধ করে তাকিয়ে রইলো। পনের বিশজন পুলিশ এসে বাড়ির ভেতর থেকে সবাইকে খাড়া করালেন এবং টেনে ধরলেন । কাস্ত্রোর মোবাইলটা চেক করলেন তাঁদের সম্মুখে থাকা লোকটা, অফিসারে গোছের মোনুষ, কারণ তারা সবায় স্যার স্যার করতে করতে মুখে ফ্যানা তুলছে । উপর¯ুÍ অফিসার হয়তো। এক এক করে সবার নাম জিজ্ঞেস করলেন, কোথা থেকে এসেছি জিজ্ঞেস করছে বারবার। নামগুলো আমি মনোযোগ সহকারে শুনছি। টিটো এসেছে যুগোস্লাভিয়া থেকে। জামাল আব্দুল নাসের, মিশরের, জহর লাল নেহেরু পাশের দেশ থেকে। পুলিশ অফিসারটা বললেন সবকটার মোবাইল চেক করো যা আছে নিয়ে নাও। নাম্বার, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামকিচ্ছু বাদ যাবে না। কাস্ত্রো মোটেও বিচলিত নয়। সম্মুখে একজন খেটে খাওয়া মানুষ। খুব নগন্য মানুষ, সে বাদ গেল না। এরা ইতিহাসের নক্ষত্র, তাদের যা হবে তারও তাই হবে, সুতরাং ভয়ের কিছু নেই মৃত্যুই তো উৎসব। তারা উৎসব করবে এই মানুষটার পরিজন কাঁদবে। উৎসব করুক কিংবা কাঁদুক তার কী? কোন অন্যায় তো করেনি, ইতিহাসের ধোঁয়া দেখতে এসেছে। সবটুকু ইতিহাস এই বাড়ির পাতাও কিন্তু ইতিহাস, ভেঙে জলাশয় হতে পারে, নদী হতে পারে, সমুদ্রে মিশেও যেতে পারে কিন্তু মনপবনে যে হাওয়া উড়ছে তা যুগ যুগ ধরে সনাক্ত করে টিকে থাকবে কেউ আর উড়িয়ে কিংবা মুছেও দিতে পারবে না ; অসম্ভব। ইতিহাস কখনো বিলুপ্ত হয় না বরং সৃষ্টি হয় – নতুন আরও নতুন ইতিহাস গড়ে ওঠে।
ভেতর থেকে একটা আধভাঙা ইট খসে পড়লো। কেউ ডাকছে ভাঙা বাড়ির জানালা ধরে কেউ ডাকছে, ইশারা করছে। ভেতরে যেতে বলছে। কণ্ঠটা চেনা, চেনাই তো। জন্ম হয়েছে যে কণ্ঠের ধ্রুব শক্তিতে, সেই কণ্ঠ ভুলে থাকা সহজ নয়, বরং মনে রাখতে হচ্ছে – আছে তো- নিরব সত্যের মতো গেঁথেই আছে ।
ডাকছে, কে ডাকছো
তোমরা এসেছো? জনতা দাঁড়ানো , ভাঙা বাড়ির জানালা বরাবার তাকালেন, শুনতে পেলেন ভাইয়েরা আমার, তোমরা আমার ভাই। মোবাইল গেঁটে গেঁটে দেখছে উপরস্তু অফিসার। অস্যমনস্ক সে , আরেকটি ইট পড়ে অফিসারের সোজা মাথার ওপর, দেখতেই কাস্ত্রো তাকে টান দিয়ে সরালেন। কাস্ত্রো বললেন, তোমরা কজনকে দেখবে। কী জাতি তোমরা, গোলামির রক্ত, শরীরে মনে ও মগজে, শুদ্ধ হতে পারলে না ; আর কবে পারবে। যাও, আজ তো তুমিও মরতে, আমাদের ছেড়ে দাও। না না কোথাও যেতে পারবে না, দাঁড়াও গারদে যাবে। সোজা গারদে, ওঠাও সব কটাকে । ওঠাও। হাসতে লাগলেন, দ্যাখো একটু ঘুরে দ্যাখো, দেখো আরেকটু পেছনে দ্যাখো। ভাঙা বাড়ির ইটের ভেতর থেকে মানুষ বের হচ্ছে। মানুষ আর মানুষ। দুনিয়া কাঁপানো মানুষ । তিনি দাঁড়িয়ে বলছেন কী দেখছে তারা…
















